
মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল রাইচরণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ভয়াবহ অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা অধিদপ্তরের তদন্ত দল। সম্প্রতি দাখিল করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক ও বর্তমান প্রধান শিক্ষকসহ গভর্নিং বডির কয়েকজন সদস্য যোগসাজশে বিদ্যালয়ের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাবেক প্রধান শিক্ষক এ. এস. এম. রফিকুল আলা একাধিক খাতে প্রায় ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অন্যদিকে, বর্তমানে দুর্নীতির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত প্রধান শিক্ষক শেখ আ. মান্নানের বিরুদ্ধে প্রায় ২৯ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। তদন্ত দলের ভাষায়, “বিদ্যালয়টির আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে একটি সংগঠিত অনিয়মের চক্র সক্রিয় ছিল।”
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রধান শিক্ষক শেখ আ. মান্নানের নিয়োগ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায়ই সাবেক সভাপতি হুমায়ুন রশিদ মুহিত নতুন গভর্নিং বডি গঠন করে তাকে নিয়োগ দেন, যা স্পষ্টতই বিধিবহির্ভূত। একইভাবে সহকারী শিক্ষিকা সুবর্ণা জামানকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়।
অর্থনৈতিক খাতে একের পর এক গরমিল ধরা পড়ে। তদন্তে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন তহবিল থেকে অন্তত আরও ৩৪ লাখ ৬১ হাজার ৪৫২ টাকা অনিয়মিতভাবে ব্যয় বা আত্মসাৎ করা হয়েছে। তবে রেকর্ডপত্র ও ভাউচার গায়েব থাকায় তদন্ত দল মনে করছে, প্রকৃত অনিয়মের পরিমাণ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাবেক প্রধান শিক্ষক রফিকুল আলা অবসরের ঠিক আগে ২৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র গায়েব করে দেন। অবসর নেওয়ার সময় তিনি পরবর্তী প্রধান শিক্ষকের কাছে কোনো আয়–ব্যয়ের দলিল হস্তান্তর করেননি। তার মেয়াদে রেজুলেশন ছাড়াই ব্যাংক থেকে ৫১ লাখ টাকা উত্তোলন করে সাবেক সভাপতি হুমায়ুন রশিদ মুহিতের ব্যক্তিগত হিসাবে স্থানান্তরের ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির ১ লাখ ৪ হাজার টাকা বিতরণ ছাড়াই তোলা হয়। দোকান ভাড়া বাবদ ৬৩ হাজার ৯০০ টাকা এবং সাধারণ তহবিলের ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা –এরও কোনো হিসাব মেলেনি। বিদ্যালয়ের ক্যাশ বহিতে একাধিক জায়গায় অঙ্কের গরমিল পাওয়া গেছে।
তদন্ত কমিটির সদস্য শিক্ষা পরিদর্শক মো. জহিরুল ইসলাম ও অডিট কর্মকর্তা চন্দন কুমার দে প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন। তাঁরা বিদ্যালয়ের সব আর্থিক রেকর্ড দ্রুত উদ্ধার ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দিয়েছেন।
স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকেরা বলছেন, “প্রধান শিক্ষক আর সভাপতির যোগসাজশ ছাড়া এমন দুর্নীতি সম্ভব না।” তাঁদের দাবি, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন অনিয়মের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
Leave a Reply