
নাকোল রাইচরণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
অভিযোগের তীর সাবেক সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে, সরকারি অডিট দাবি বর্তমান কমিটির।
মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নাকোল রাইচরণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং নিয়োগ বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের নতুন এডহক কমিটির অভ্যন্তরীণ অডিটে উঠে এসেছে প্রায় ৪ কোটি টাকার দুর্নীতির চিত্র। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি এবং শ্রীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমাউনুর রশীদ মুহিত ও সাবেক প্রধান শিক্ষক এএসএম রফিকুল আলা।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে রফিকুল আলা ২০১২ সাল থেকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ২০১৮ সালের আগ পর্যন্ত কোনো অডিট না হওয়ায় স্বচ্ছ হিসাবের ঘাটতি প্রকট। ২০১৮ সালের পর বিদ্যালয়ের আয় দেখানো হয়েছে ৪ কোটি ১৩ হাজার ৬৬১ টাকা, অথচ ব্যয় দেখানো হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৭০ লাখ ১০ হাজার ২১৩ টাকা। তহবিল থেকে ১ কোটি ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৮১ টাকা ব্যাংকে জমা করা হলেও বাকি ৩ কোটি ২ লাখ ৮৭ হাজার ৮০ টাকার কোনো হিসাব নেই।
সাবেক সভাপতি মুহিত ২০১৭ সালে ক্ষমতায় বসে দীর্ঘ সাত বছর একই পদে থেকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। বিদ্যালয় ভবনের সঙ্গে ১০৮টি দোকানঘর নির্মাণ করে দোকান প্রতি প্রায় ৩ লাখ টাকা আদায় করা হলেও তার কোনো চুক্তিপত্র বা হিসাব পাওয়া যায়নি। এই খাত থেকে ৩ কোটি ২৪ লাখ টাকার আয় দেখানোর কথা থাকলেও ক্যাশবুকে মাত্র ৯৪ লাখ ৫৯ হাজার ৩৫২ টাকা উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাব থেকে প্রধান শিক্ষক রফিকুল আলা সময় সময়ে সভাপতি হুমাউনুর রশীদের ব্যক্তিগত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে ৫১ লাখ টাকা ট্রান্সফার করেন। অবসরের সময় তিনটি চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করেন আরও ২৩ লাখ টাকা। পরবর্তী মাসগুলোতে দোকান বরাদ্দ দিয়েও বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
রফিকুল আলা অবসরে গেলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় সহকারী শিক্ষক সুবর্ণা জামানকে। অভিযোগ রয়েছে, মাত্র ৭ দিনের ওই দায়িত্বকালেই তিনি ৩২ লাখ টাকার আর্থিক সুবিধা নিয়ে শেখ আবদুল মান্নানকে নতুন প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে সহায়তা করেন। শেখ আবদুল মান্নান দায়িত্ব নেবার মাত্র ১০ মাসের মধ্যে ২৪ লাখ ২৪ হাজার ৪৮৩ টাকা তহবিল থেকে তুলে ভাউচারের মাধ্যমে ব্যয়ের হিসাব দেখান, যার অধিকাংশই সন্দেহজনক বলে অভ্যন্তরীণ অডিটে উল্লেখ রয়েছে।
এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক শেখ আবদুল মান্নান বলেন, “টাকা ব্যাংকে জমা না করাটা অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় কাজে ওই অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, যার যথাযথ ভাউচার রয়েছে।”
তবে সাবেক সভাপতি হুমাউনুর রশীদ মুহিত এবং প্রধান শিক্ষক রফিকুল আলার সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।
বিদ্যালয়ের বর্তমান এডহক কমিটির সভাপতি ও আয়কর উপদেষ্টা মির্জা ওয়ালিদ হোসেন শিপন বলেন, “প্রধান শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে। এসব কাজে শিক্ষা অফিসের কিছু কর্মকর্তাও জড়িত ছিলেন। আমরা সরকারি অডিট ও তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।”
এ বিষয়ে মাগুরা জেলা শিক্ষা অফিসার মো. আলমগীর কবীর বলেন, “বেতন ছাড় ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তা লিগ্যাল অ্যাডভাইজারের পরামর্শ অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। কোনো অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের প্রশ্নই ওঠে না।”
স্থানীয়রা দাবি করছেন, দ্রুত সরকারি অডিটের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আর কখনও দুর্নীতির আশ্রয়স্থল না হয়।
Leave a Reply