
আজকের মাগুরা: স্বাগতম আপনাকে। দীর্ঘ ৩৩ বছর পর জাকসু নির্বাচন হতে যাচ্ছে। আপনি নিজেও এই দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। জাহাঙ্গীরনগরের একজন শিক্ষক এবং আবাসিক নাগরিক হিসেবে আপনি এ নির্বাচনকে কীভাবে দেখছেন?
অধ্যাপক গোলাম রব্বানী: ধন্যবাদ। আমি প্রায় ১৯ বছর ধরে জাহাঙ্গীরনগরে শিক্ষকতা করছি, এর আগে এখানে ছাত্র ছিলাম। ফলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো-মন্দের সঙ্গে আমার গভীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো-মন্দ মানেই শিক্ষার্থীদের স্বার্থ। সেই বিবেচনায় জাকসু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ৩৩ বছর ধরে এখানে জাকসু হয়নি। অথচ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৭৩ অনুযায়ী, জাকসুর দায়িত্ব হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী বডি সিনেটে পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধি পাঠানো। গত ৩৩ বছর ধরে ছাত্র প্রতিনিধি না থাকায় সিনেট আসলে পূর্ণাঙ্গ ছিল না। আমি ২০২৪ সালে সিনেটে নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়ে স্পষ্টভাবে বলেছিলাম—জাকসু ছাড়া সিনেট বৈধতা পায় না।
ভিসিকেও অনুরোধ করেছিলাম দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার জন্য। অবশেষে আজ নির্বাচন হচ্ছে। এটি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ ৩৩ বছরের অপেক্ষার অবসান এবং নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ঘটনা।
—
আজকের মাগুরা: কিন্তু এই নির্বাচন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ক্ষমতা কাঠামো বা ক্ষমতার চর্চায় কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে বলে আপনি মনে করেন?
অধ্যাপক গোলাম রব্বানী: অবশ্যই রাখতে পারে। কারণ ছাত্ররা চাইলে পরিবর্তন আনতে সক্ষম—এটা আমরা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে দেখেছি। তবে অভিজ্ঞতা হলো, ছাত্ররা যখন ঐক্যবদ্ধ থাকে তখন অভূতপূর্ব সাফল্য আসে, আবার বিভক্ত হলে সেই অর্জন দ্রুতই হাতছাড়া হয়।
আমি বলতে চাই, এ নির্বাচনের মাধ্যমে যারা আসবেন, তাদের প্রতি আমার প্রত্যাশা এখন অনেক কমে গেছে। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তাদের কাছ থেকে যে প্রত্যাশা ছিল, তা বিগত এক বছরে ম্লান হয়েছে। কোনো কোনো সংগঠন মনে করেছে সব অর্জন তাদেরই; তারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে। সেই জায়গা থেকে আমার আশাটা কমে গেছে।
—
আজকের মাগুরা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচনে আমরা দেখেছি শিবির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, যদিও সেটি নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর সবসময়ই প্রতিবাদী চরিত্রের জন্য পরিচিত। আপনি মনে করেন জাহাঙ্গীরনগরের ফলাফল আলাদা হতে পারে? নাকি এখানেও একই ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং হবে?
অধ্যাপক গোলাম রব্বানী: কোনো নির্দিষ্ট ছাত্র সংগঠন বা রাজনৈতিক দল নিয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না। আমি শুধু চাইব—নির্বাচন যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। এটিই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
—
আজকের মাগুরা: জাহাঙ্গীরনগরকে সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা হয়। গবেষণার পরিবেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্বতা অক্ষুণ্ণ রাখতে নতুন জাকসু কী ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন?
অধ্যাপক গোলাম রব্বানী: অনেক কিছুই করার আছে। একসময় জাহাঙ্গীরনগরের সাংস্কৃতিক শক্তি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল, যা ক্যাম্পাসকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরেই এখানে সংকটও বিদ্যমান।
যদি নবনির্বাচিত জাকসু সদস্যরা রাজনৈতিক ব্যানার বা মতাদর্শের পরিবর্তে শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণা ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে অগ্রাধিকার দেন—তাহলে জাহাঙ্গীরনগর একটি বিশ্বমানের গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নিতে পারে। কিন্তু যদি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কেবল রাজনৈতিক দলগুলো জয়ী হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আজকের মাগুরা: আজ সারা দিন ভোট। ভোটাররাই ঠিক করবে জাহাঙ্গীরনগরের ভবিষ্যৎ। একজন সিনিয়র ভাই হিসেবে বর্তমান শিক্ষার্থীদের কী বলতে চান?
অধ্যাপক গোলাম রব্বানী: আমার আহ্বান হলো—সবাই যেন ভোটকেন্দ্রে যায় এবং সুবিবেচনা করে ভোট দেয়। তারা যেন এমন নেতৃত্ব বেছে নেয়, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে কাজ করবে, কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করবে না। এটাই আমার অনুরোধ শিক্ষার্থীদের প্রতি।
আজকের মাগুরা: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
অধ্যাপক গোলাম রব্বানী: তোমাকেও ধন্যবাদ, ইউনুছ।
Leave a Reply